OrdinaryITPostAd

হারিয়ে গেছে আমাদের বুনিয়াদি “মক্তব” শিক্ষা

 

আলিফ, বা, তা, ছা... অথবা আলিফ যবর আ। বা যবর বা। তা যবর তা। ছা যবর ছা। এ আরবি বর্ণগুলো মাথা ঝুঁকে সুরে সুরে কোরাসকণ্ঠে মসজিদের ভেতর অথবা বারান্দায় বসে গাঁয়ের শিশু-কিশোর ছেলে-মেয়েরা পাঠ করতো। এক সময় এটাই শিক্ষাজীবনের প্রথম পাঠ ছিল। যা 'মক্তব শিক্ষা' নামেই সর্বজনের কাছে ছিল পরিচিত। কিন্তু বর্তমানে তা অনেকটা 'সেকেলের পাঠ' হিসেবে তথাকথিত আধুনিক শিক্ষিত মানুষের কাছে বিবেচিত। দুঃখজনক হলেও সত্য, কালের করাল গ্রাসে তলিয়ে গেছে রহমত ও নেয়ামতে পরিপূর্ণ আমাদের শিশু-কিশোরদের বুনিয়াদি এ 'মক্তব শিক্ষা'। সকালের সূর্য উকি দেওয়ার সাথে সাথেই মায়েরা তাদের শিশু- সন্তানদের এ 'মক্তব' শিক্ষা পাঠে পাঠিয়ে দিতেন, কাছে কিংবা দূরের কোনো মসজিদে। দলবেঁধে এ সব শিশু-কিশোররা বুকে আগলে ধরে কোরআন, কেউ ছিপারা, কেউ বা কায়দা নিয়ে আনন্দ করতে করতে মক্তবে হাজিরা দিতো। সে দৃশ্য যে কত মনোমুগ্ধকর ছিল তা কাল্পনা করাও দুষ্কর। শুধু কি তাই? শিশির ভেজা হিমেল বাতাস আর ভোর সকালের হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, সম্ভবত সে দিকটাও বিবেচনায় রেখে মা তার সন্তানকে সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে তুলে দিতে দ্বিধা করতেন না। ঘুমে কাতর এসব শিশু-কিশোররা লেপ- মুড়িয়ে মায়ের আঁচল থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হতো। সচেতন মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এই অসাধ্য কাজটাই করে যেতেন নিয়মিত। তারা একটি রুটিন করে তাদের শিশুসন্তানদের ফজরের নামাজ পড়ায়ে 'মক্তব' পাঠদানে পাঠিয়ে, দিনের কাজ শুরু করতেন। যার ফলে শারীরিক কসরত বা ব্যায়াম বলতে যা বুঝায় তার ষোলআনাই হয়ে যেত এসব শিশু-কিশোরের।


মক্তব কী

মক্তব কী? কি-ই বা কাজ, সে বিষয়ে প্রথমে আমাদের একটু ধারণা নেওয়া দরকার। 'মক্তব' হলো একটি আরবি শব্দ যার শাব্দিক অর্থ পাঠশালা বা বিদ্যালয়। ফার্সি এবং উর্দুতেও এর যথেষ্ট ব্যবহার রয়েছে। খোলাসা করে বললে 'মক্তব' বলতে আমরা মসজিদে পরিচালিত কায়দা, ছিপারা ও কোরআনের পাঠশালাকেই বুঝে থাকি। যাকে ইসলামী শিক্ষারীতির প্রাথমিক বিদ্যালয়ও বলা চলে। কোমল মনের শিশুদের কোরআন শিক্ষা তথা ইসলাম সম্পর্কে প্রাথমিক বা মৌলিক জ্ঞান অর্জনের স্থান-ই হলো 'মক্তব'। যেখানে মুসলিম পরিবারের শিশুদেরকে আরবি হরফ,


শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত শেখার পাশাপাশি নামাজ-রোজার নিয়ম কানুন, জরুরি মাসলা-মাসায়েল, দোয়া-কালাম, আদব- কায়দা, ধর্মীয় রীতিনীতি, নীতি- নৈতিকতা, মা-বাবা-প্রতিবেশী মুরব্বিদের সাথে তমিজ- কায়দা আচার-আচরণ ইত্যাদি সার্বিক বিষয়ে জানা বা শিক্ষা নেওয়ার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকে।

মনীষীদের দৃষ্টিতে মক্তব

জগদ্বিখ্যাত মনীষীরা মক্তবের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তাদের মূল্যবান অভিমত আমাদের কাছে পেশ করেছেন। যেমন- ইতিহাসবিদ এ আর মল্লিক মক্তব সম্বন্ধে লিখেছেন, 'বাংলার মুসলমানদের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যখন কোনো সন্তানের বয়স চার বছর চার মাস চার দিন পূর্ণ হতো তখন তার বিদ্যাশিক্ষার সূচনা হতো। একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পবিত্র কোরআনের কিছু অংশ শিশুকে পাঠ করে শোনানো হতো। শিশু তা পুনরাবৃত্তি করত। এ ছিল প্রতিটি মুসলিম পরিবারের অপরিহার্য প্রথা।'


বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ইবনে সিনা মক্তবের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে তার একটি বইয়ে 'শিশুদের প্রশিক্ষণ ও গড়ে তোলায় শিক্ষকের ভূমিকা' শীর্ষক একটি দিকনির্দেশনামূলক অধ্যায় রচনা করে গেছেন। তিনি তার রচনায় বলেন যে, একজন শিশু ব্যক্তিগতভাবে গৃহশিক্ষকের চেয়ে শ্রেণিকক্ষে অধিক উত্তমভাবে শিক্ষালাভ করতে পারে। এর কারণ হিসেবে তিনি ছাত্রদের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এবং দলগত আলোচনা ও বিতর্কের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেন। মক্তবের পাঠ্যক্রম সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি পাঠের সুবিধার জন্য দুটি পর্যায়ের কথা তুলে ধরেন। যেমন ১. প্রাথমিক শিক্ষা ২. মাধ্যমিক শিক্ষা।


“একটি শিশু তার মানবিক, সামাজিক ও ব্যক্তিজীবন সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে যে রসদের প্রয়োজন তাই মক্তব শিক্ষা”


প্রাথমিক শিক্ষায় তিনি লিখেছেন, শিশুর বয়স যখন ৬ বছর হয়, তখন থেকে তাকে মক্তবে পাঠানো উচিত। তার মতে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা দিতে হবে এবং এ সময়ের মধ্যে তাদের কুরআন, ইসলামী অধিবিদ্যা, ভাষা, সাহিত্য, ইসলামী নীতিবিদ্যা ও অন্যান্য দক্ষতা, যেমন বিভিন্ন ব্যবহারিক জ্ঞান শিক্ষায় তাকে দক্ষ করে তুলতে হবে।


দ্বিতীয় পর্যায়ে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষাকে বিশেষায়িত সময় বলে উল্লেখ করেছেন। যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের সামাজিক অবস্থানের আওতামুক্ত থেকে বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠবে। তিনি লিখেছেন যে ১৪ বছরের পর একজন শিশুকে শিক্ষার জন্য নিজের পছন্দের বিষয় বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত যাতে সে তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য পথ খুঁজে নিতে পারে।' সার্বিক দিক আলোচনা করলে যে জিনিসটা আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে তা হলো একটি শিশু তার মানবিক, সামাজিক ও ব্যক্তিজীবন সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে যে রসদের প্রয়োজন তাই মক্তব শিক্ষা। যা যুগের পর যুগ এ উপমহাদেশে ধারাবাহিকভাবে চলে আসছিল।

মক্তব শিক্ষার ইতিহাস

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, আমাদের ভারতবর্ষে মক্তব ও মাদরাসা শিক্ষার হাতেখড়ি বা সূচনা হয় ৭১১ সালে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মধ্য দিয়ে। তবে শুরুর দিকে এর কোনো মজবুত ভিত্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ছিল না। দ্বাদশ শতকের শেষ দিকে ভারতবর্ষে মুহাম্মদ ঘোরি তুর্কি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে ১১৯১ সালে আজমিরে একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। এরই পথ ধরে এ মহাদেশে মূলত মোগল আমল থেকে মক্তব ও মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তার ঘটতে থাকে। কালের প্রবাহে এ শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাপক জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য হলে এ অঞ্চলে এটি একটি মজবুত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে। ইতিহাস থেকে আরো জানা যায় মুসলিম সুলতানি যুগ থেকে শুরু করে মোগল আমল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৮০০ বছর মুসলমানদের কাছে ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব ছিল প্রবল। প্রতিটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ক্ষমতাসীন শাসকরা। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় মক্তব শিক্ষাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে শাসকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কারণ একটি উন্নত জাতি বিনির্মাণে উক্ত শাসকরা ছিলেন বদ্ধপরিকর, সে কারণে তারা তার জাতিকে উন্নত চরিত্র গঠন করার জন্য ধর্মীয় শিক্ষাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

মক্তব শিক্ষার গুরুত্ব

'শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড' শিক্ষা ছাড়া কোনো কালে কোনো জাতি উন্নতি করেছে বলে পৃথিবীতে কোনো ইতিহাস নেই। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত তবে শর্ত যে, সে শিক্ষার সাথে ধর্মীয় শিক্ষার সংমিশ্রণ থাকা বাঞ্ছনীয়। কারণ ধর্মীয় শিক্ষার আলো না থাকলে সে কখনো আলোকিত মানুষ হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষী, পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যারা যত ভালো কাজ করেছে বা করছে তারা কোনো না কোনো ধর্মীয় শিক্ষার আলোতে আলোকিত। ধর্ম-ই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে সকল পাপকাজ ও অপরাধ বোধ থেকে। দুনিয়ার সকল কাজের জবাবদিহিতা শেষ বিচারে দিতে হবে, এ বোধশক্তি একজন মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত ধারণ করতে পারবে না সে ততক্ষণ ভালো মানুষ হতে পারবে না। অর্থাৎ বলা যায়, যে শিক্ষা মানুষকে তার স্রষ্টার কাছ থেকে দূরে রাখে সে শিক্ষায় শিক্ষিত কোনো ব্যক্তি- সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার বা জাতির জন্য কল্যাণ ছিনিয়ে আনতে পারে না। খোদাভীরু মানুষ-ই সমাজের অহঙ্কার, জাতির শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। বিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টটলের মতে, 'শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো ধর্মীয় অনুশাসনের অনুমোদিত পবিত্র কার্যক্রমের মাধ্যমে সুখ লাভ করা।' মানবতার শ্রেষ্ঠ উপহার ও মহান শিক্ষক আমাদের মহানবী (সা.) একটি উন্নত জাতি গড়ার লক্ষ্যে ইসলাম প্রচারের সূচনা থেকেই ইসলাহী শিক্ষার নিয়মনীতি প্রবর্তন করেন। দৈ প্রবর্তনের ধারা অনুযায়ী মসজিদকেই শিক্ষাকেন্দ্রর মূল প্রাণ হিসেবে ধরে নেন। কালের পথ ধরে এই মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে মসজিদভিত্তিক মক্তব শিক্ষার পাঠশালা। যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে ছোটো ছোটো কিশোর-কিশোরীদের মানবিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস চিন্তা-চেতনা, আচার- আচরণ, আদর্শ, নিয়ম-নীতি, রীতি নীতির সবক শেখানো হতো। অর্থাৎ একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে যে যে উপাদানের প্রয়োজন তার সবটিই এ মক্তব শিক্ষার মাধ্যমে দেওয়া হতো। আল্লামা ইকবালের মতে, 'পূর্ণাঙ্গ মুসলিম তৈরি করাই হবে শিক্ষার উদ্দেশ্য। সুতরাং বলা যায়, শিশু বয়সে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার উপযুক্ত সময়, এ সময়ের শিক্ষা একজন শিশুর মূল ভিত্তি গড়ে দেয়। যে ভিত্তির ওপর ভর করে, তার জীবনে সে বিশাল ইমারত গড়ে তুলতে পারে অর্থাৎ তার বিশ্বাস, নীতি-নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা, পারস্পরিক সম্মানবোধ, সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবারে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য তথা যাবতীয় মানবীয় গুণাবলি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ধারণ করতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট

বর্তমান প্রেক্ষাপট আমাদের হতাশা ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ সভ্য ও আলোকিত মানুষ পড়ার অন্যতম প্রধান যে নিয়ামক 'মক্তব' শিক্ষা তা আজ প্রায় বিলুপ্ত। নানান সমস্যা, অবহেলা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, সর্বোপরি সময়ের সাথে তাল রেখে অতি মাত্রায় আধুনিক হতে গিয়ে আমরা আমাদের মৌলিকত্ব বিসর্জন দিয়েছি। আমাদের ঘাড়ে স্বত চেপেছে আমরা আমাদের সন্তানদের তিলে তিলে হেসে হেসে খুন করছি, কীভাবে করছি তা বুঝার বোধ শক্তিটাও হারিয়ে ফেলেছি। আজ আল্লামা ইকবালের সেই আশঙ্কা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। তিনি এক জায়গায় মক্তব ও মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে যা বলেছিলেন, যার সারমর্মম ছিল, 'যদি এ মরুন-মাদরাসাগুলো না থাকতো, মুসলমানদের সন্তানরা পশ্চিমা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের অভ অনুসরণে নিজেদের মুসলমান পরিচয়ও হারিয়ে ফেলত। মুছে যেত মুসলমানদের আদর্শ, স্বকীয়তা, আত্মত্মগৌরব ।'অস্বীকার করার উপায় নেই, বর্তমান সমাজে উল্লেখযোগ্য একটি শ্রেণি পশ্চিমা ইহুদি-খ্রিষ্টানদের অন্ধ অনুসরণ করে তথাকথিত প্রগতিশীল বলে নিজেকে জাহির করছে, নিজেদের ধর্মীয় অনুশাসনকে সেকেলে শিক্ষা বলে তাচ্ছিল্য করছে।


“শিশু-কিশোরের নৈতিকতার উন্নয়নে পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রভাব অনস্বীকার্য। তবে পরিবারের ভূমিকাই মুখ্য”


মুসলমানদের আদর্শ, স্বকীয়তা, আত্মগৌরব স্কুলে নিজেদের গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে। ধর্মীয় শিক্ষার নাম শুনলেই তাদের গায়ে আগুন লাগে, তারা তাদের সন্তানদের স্মার্ট বানাতে গিয়ে ধর্মীয় নীতিমালা বহির্ভূত গান, নাচ, অভিনয় আর্টসর এহেন এমন কোনো শিক্ষা নেই যা দিয়ে যাচ্ছেন না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বিনিময়ে এসব তথাকথিত স্মার্ট শিশুরা কিশোর বয়সে পা দিয়েই তাদের মা-বাবার দেওয়া শিক্ষার আসল স্মার্টরূপ জাতির কাছে তুলে ধরে বা সামান্য তথ্য তুলে ধরলে কথাটা পরিষ্কার হবে বলে মনে করি। বর্তমান বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের একটি চিত্র গত ১১ জানুয়ারি পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ তুলে ধরেন। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, পুলিশের জন্য কিশোর গ্যাং বা কিশোর অপরাধীরাই এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। পরিবার-সমাজ কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয়-পর্যাপ্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলে এর নেতিবাচক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার চৌহদ্দি নির্ধারণ অসম্ভব হয়ে উঠবে। র‍্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত র‍্যাবের হাতে ২৮২ জন কিশোর অপরাধী গ্রেফতার হয়েছে।


কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের তথ্যমতে, কেন্দ্রে অবস্থানরত ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সী কিশোরদের ২০ শতাংশ হত্যা এবং ২৪ শতাংশ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদক সেবন, ক্রয় ও বিক্রয়, অস্ত্র ব্যবহার-ব্যবসা ইত্যাদি জঘন্য কাজের অপরাধী।


২০১৭ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের প্রতিবেদনে জানায়, ঢাকা ও এর আশপাশে ১২টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। সংস্থাটি আরও জানায়, সারা দেশে আরও কমপক্ষে ৩৫টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সব কয়টি বাহিনীকে দিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলে। তা ছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত ও নৃশংসতা আমরা প্রায়ই জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম হতে দেখি। এ সবই হচ্ছে আধুনিক মা-বাবার স্মার্টনেস সন্তানের স্মার্ট শিক্ষার সামান্য চিত্র মাত্র। সুতরাং প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক আরনল্ড টয়েনবির অভিমত অনুসারে বলা যায়, 'বর্তমানের ধর্মহীনতাই অন্যান্য অপরাধের মতো কিশোর অপরাধের অন্যতম কারণ।'


শেষ কথা

পরিশেষে আমরা বলতে চাই, ধর্মকে অবহেলা করে কোনো কালে কোনো জাতি উন্নতির শিখরে উঠছে বলে ইতিহাস নেই। ধর্মীয় শিক্ষাই মানুষের চরিত্রকে উন্নত মানে উন্নীত করে। একটি উন্নত সমাজ গড়তে ও কিশোর মনে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে ধর্মীয় নীতিমালা আমাদের অবশ্যই মানতে হবে। এ প্রসঙ্গে বিশ্ববরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ ও দার্শনিক ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন, শৈশবকাল থেকেই মূলত নৈতিকতা বিকশিত হওয়া শুরু হয় এবং কৈশোরকালের শেষ পর্যায়ে গিয়ে চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করে। শিশু-কিশোরের নৈতিকতার উন্নয়নে পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রভাব অনস্বীকার্য। তবে পরিবারের ভূমিকাই মুখ্য। মা-বাবা নৈতিকতা মেনে চললে এবং শিক্ষা দিলে শিশু-কিশোররা তা অনুকরণ করে মেনে চলতে শিখবে। সুতরাং দ্বিধাহীন ভাষায় বলা যায় শিশুকাল থেকে চরিত্র গঠনের নৈতিক গুণাবলি অর্জন করতে পারলে কিশোর অপরাধ প্রবণতা কমে যাবে। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত চরিত্র গঠনের উত্তম গুণাবলি যেমন তাকওয়া, লজ্জাশীলতা, সত্যবাদিতা, ওয়াদা পালন, আমানতদারিতা, সবর, ইহসান, বিনয়, নম্রতা, উদারতা ও দানশীলতা প্রভৃতি ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় আর সে শিক্ষার হাতেখড়ি 'মক্তব' শিক্ষার মাধ্যমেই আমরা পেয়ে থাকি। তাই একটি উন্নত জাতি গঠনে মক্তব শিক্ষার প্রতি আমাদের জোর দেওয়া একান্ত কর্তব্য বলে মনে করি।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ১

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ২

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৩

এইটা একটি বিজ্ঞাপন এরিয়া। সিরিয়ালঃ ৪